এক বিঘা জমির পাট জাগ দিতে ভাড়া দুই হাজার টাকা

130

দাম ভালো থাকায় কৃষকরা এবার ব্যাপকহারে পাট চাষে ঝুঁকেছেন। কিন্তু দীর্ঘ অনাবৃষ্টি আর খরায় পানির অভাবে পাট জাগ দেয়া নিয়ে রাজশাহীর কৃষকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে পুকুর ভাড়া নিয়েই দিচ্ছেন পাট জাগ। এর জন্য প্রতি বিঘা জমির পাট জাগ দিতে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে দুই হাজার টাকা।

খরাপ্রবণ রাজশাহী এলাকায় দীর্ঘদিন বৃষ্টির দেখা নেই। মাঝে মাঝে হালকা হলেও এতে পুকুরে পানি জমছে না। তাই পুকুর মালিক শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি জমিয়ে রেখে পুকুর প্রস্তুত করে রাখছেন। সেই পুকুরে এলাকার চাষিরা পাট জাগ দিচ্ছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর রাজশাহী জেলায় ১৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ৪৪২ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে পাট চিকন (পাতলা) ও ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে চাষিরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে জেলার বাঘা উপজেলার কৃষকেরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় তিন হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। পাট চাষে মোটামুটি অনুকূল আবহাওয়া ছিল। বর্তমানে পাট কাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছোড়ানো এবং শুকানোর কাজ করছেন চাষিরা। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এরই মধ্যে নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে। শুকনো পুকুরে পানি জমিয়ে অনেকে পাট জাগের জন্য পুকুর লিজ দিচ্ছেন। এতে চাষিদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঝে মাঝে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতে দাবদাহ কিছুটা কমলেও পাট ও আমন ধান চাষাবাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। কেননা, পাট কাটার পর সেই জমিতে আমনের চাষাবাদ করার কথা চাষিদের। কিন্তু পানির অভাবে জাগ দিতে না পারায় সেই পাটগাছ জমিতেই শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে। একই কারণে আমন ধানও রোপণ করতে পারছেন না চাষিরা। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।

হামিদকুড়া গ্রামের পাটচাষি হাবিবুর রহমান বলেন, আমার দুই বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছিলাম। বৃষ্টি না থাকায় পাট জাগ দিতে পারছিলাম না। পাট কাটার পর জানতে পারলাম, বেলাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি নিজের শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিয়ে পাট জাগ দেয়ার জন্য পুকুর প্রস্তুত করে রেখেছেন। চার হাজার টাকায় দুই বিঘা জমির পাট জাগ দিয়েছি। আমার মতো অনেকেই এই পুকুরে পাট জাগ দিয়েছেন।

আরেক পাটচাষি আনার আলি বলেন, অনাবৃষ্টির কারণে এবার খালে বা বিলে পানি নেই। এদিকে পাট কাটার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু জাগ দেয়ার পানি না থাকায় পাট কাটতে পারছিলাম না। শেষে উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে দুই হাজার টাকা বিঘা হিসেবে পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট জাগ দিচ্ছি। একই এলাকার আমজাদ আলি বলেন, এবার বৃষ্টি কম ও খরা বেশি হওয়ায় পাটগাছ তেমন বড় হয়নি। আগে বিলে বা নদীতে বেশি পানিতে পাট জাগ দিয়ে ওপরে কলাগাছ দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হতো। এতে পাটের আঁশের রং ভালো হতো। কিন্তু পানি না থাকায় অল্প পানিতে কাদামাটি দিয়ে চাপা দিয়ে পাট জাগ দেয়ায় আঁশের রং বেশি ভালো হচ্ছে না। এতে এসব পাটের দাম কম হবে।

জোতরঘু গ্রামের পুকুর মালিক বেলাল হোসেন বলেন, এলাকায় অনেক দিন থেকে বৃষ্টি নেই। আগে একটু পানি ছিল, এতে এসে পাট জাগ দিতে চাচ্ছিলেন চাষিরা। আমি চিন্তা করে দেখলাম, আমার শ্যালো মেশিন আছে, এই মেশিন দিয়ে পুকুরে পানি দিয়ে প্রস্তুত করি। তারপর চাষিদের একটি শর্তে পাট জাগ দিতে অনুমতি দিয়েছি।

উপজেলার দিঘা হাটে পাট বিক্রি করতে আসেন দিঘা গ্রামের মকুল হোসেন বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে লাঙ্গল, বীজ সেচ, কাটা, পরিষ্কার করা, সারসহ যাবতীয় খরচ হয় ১০-১২ হাজার টাকা। উৎপাদন হচ্ছে ১০-১২ মণ। বিক্রি হচ্ছে ১৮-২০ হাজার টাকায়।

অন্যদিকে জেলার পবা উপজেলার ভোলাবাড়ী এলাকার পাটচাষি হামেদ আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, অনাবৃষ্টিতে খাল-বিলের পানি শুকিয়ে পাট পচানোর জায়গার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে কেউ কেউ পাট না কেটে জমিতে রেখে বৃষ্টির অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ কেউ পাট কেটে জমিতেই ফেলে রাখায় তা শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে।

রাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, এবারে বৃষ্টি না থাকায় অনেক পাটচাষি পুকুর ভাড়া নিয়ে আবার কেউ কেউ বিঘাপ্রতি পুকুরে পাট জাগ দিচ্ছেন। এতে চাষিদেরও খরচ কিছুটা বেশি হচ্ছে। কোনো উপায় নেই। আবাদ করলে একটু খরচ কষ্ট করে করতে হয়। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এরই মধ্যে নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, ‘পানির অভাবে অনেক বিল শুকিয়ে যাওয়ায় পাট জাগ দেয়া নিয়ে চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। তবে পবার বারোনাই নদীতে পানি ও কচুরিপানা রয়েছে। সেখানে কৃষকরা পাট জাগ দিতে পারবেন। তিনি বলেন, সরকারি পাটকল বন্ধ। তবুও পাট বিক্রিতে কৃষকের সমস্যা হবে না। কারণ বেসরকারি পাট কলগুলো রয়েছে। এছাড়া বিদেশে পাটের ব্যাপক চাহিদা। ফলে কৃষকদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।