খামারের সবচেয়ে ভয়ংকর সমস্যার নাম গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ, এ রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি

285

সাম্প্রতিককালে দেশের সব জায়গায় গরুর এলএসডি আক্রান্ত হয়েছে। এলএসডি গরুর জন্য একটা ভয়ংকর ভাইরাস বাহীত চর্মরোগ যা খামারের ক্ষতির কারণ। এই রোগের গড় মৃত্যুহার আফ্রিকাতে ৪০%। মূলত আফ্রিকায় একাধিকবার মহামারী আকারে দেখা গেলেও আমাদের দেশে গরুতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কখনো মহামারী আকারে দেখা যায় নাই। একটা খামারকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দেয়ার জন্য এফএমডি বা খুরা রোগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর রোগ হিসেবে ধরা হয়।

১৯২৯ জাম্বিয়া প্রথম অফিসিয়ালি শনাক্ত হওয়া এই রোগ ১৯৪৩ সাল থেকে ৪৫ সালের মধ্যে মহাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, মোজাম্বিকসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে হাজার হাজার গরু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং শত শত খামার বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সত্তর এবং আশির দশকে আফ্রিকার প্রায় সব দেশের গরু এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে যায় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রোগের কারণ
মূলত এক প্রকার পক্স ভাইরাস বা এলএসডি ভাইরাসের সংক্রমণে গবাদিপশুতে এই রোগ দেখা দেয় এবং এক গরু থেকে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে।

রোগের সময়
প্রধানত বর্ষার শেষে, শরতের শুরুতে অথবা বসন্তের শুরুতে যে সময়ে মশা মাছি অধিক বংশবিস্তার সেই সময়ে প্রাণঘাতী এই রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

রোগের লক্ষণ
এলএসডি আক্রান্ত গরু লক্ষণ শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে :
১. আক্রান্ত গরু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং খাবার রুচি কমে যায়।
২. জ্বরের সাথে সাথে মুখ দিয়ে এবং নাক দিয়ে লালা বের হয়। পা ফুলে যায়। সামনের দু’পায়ের মাঝ স্থান পানি জমে যায়।
৩. শরীরের বিভিন্ন জায়গা চামড়া পিণ্ড আকৃতি ধারণ করে, লোম উঠে যায় এবং ক্ষত সৃষ্ট হয়। ধারাবাহিকভাবে এই ক্ষত শরীরের অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়ে।
৪. ক্ষত মুখের মধ্যে, পায়ে এবং অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫. ক্ষত স্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে। শরীরে কোথায় ফুলে যায় যা ফেটে টুকরা মাংসের মতো বের হয়ে ক্ষত হয়, পুঁজ কষানি বের হয়।
৬. পাকস্থলী অথবা মুখের ভেতরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে গরু পানি পানে অনীহা প্রকাশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।
কিভাবে ছড়ায়
লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে রোগটি অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগ এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ার

প্রধান মাধ্যমগুলো হচ্ছে :
১. মশা ও মাছি : এই রোগের ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসাবে মশা মাছিকে দায়ী করা হয়। অন্যান্য কীট পতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. লালা : আক্রান্ত গরুর লালা খাবারের মাধ্যমে অথবা খামারে কাজ করা মানুষের কাপড়ের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়াতে পারে।
৩. দুধ : যেহেতু আক্রান্ত গাভীর দুধে এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে তাই আক্রান্ত গভীর দুধ খেয়ে বাছুর দুধ খেয়ে আক্রান্ত হতে পারে।
৪. সিরিঞ্জ : আক্রান্ত গরুতে ব্যবহার করা সিরিঞ্জ থেকে এই ভাইরাসবাহিত হতে পারে।
৫. রক্ষণাবেক্ষণকারী : খামারে কাজ করা মানুষের পোশাকের মাধ্যমে আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৬. আক্রান্ত গরুর সিমেন : ভাইরাস আক্রান্ত ষাঁড়ের সিমেন এই রোগের অন্যতম বাহন, কারণ আক্রান্ত গরুর সিমেনেও এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে।
৭. শুধুমাত্র গরু মহিষ আক্রান্ত হয়, মানুষ হয় না।

প্রতিকারে কৃষক সচেতনতা ও করণীয় : যেকোন রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিকার সব সময় অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
১. আক্রান্ত গরুকে নিয়মিত এলএসডি ভ্যাকসিন দেয়া। আমাদের দেশে ইতঃপূর্বে রোগটির প্রাদুর্ভাব কম দেখা গেছে তাই এই রোগের ভ্যাকসিন সহজলভ্য নয়।
২. খামারের ভেতরের এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যেন মশা মাছির উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৩. আক্রান্ত খামারে যাতায়াত বন্ধ করা এবং আক্রান্ত খামার থেকে আনা কোনো সামগ্রী ব্যবহার না করা।
৪. আক্রান্ত গরুকে শেড থেকে আলাদা স্থানে মশারি দিয়ে ঢেকে রাখা মশা মাছি কামড়াতে না পারে। কারণ আক্রান্ত গরুকে কামড়ানো মশা মাছি সুষ্ঠু গরুকে কামড়ালে এই রোগের সংক্রমণ হতে পারে।
৫. আক্রান্ত গভীর দুধ বাছুরকে খেতে না দিয়ে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দেয়া।
৬. আক্রান্ত গরুর পরিচর্যা শেষে একই পোশাকে সুষ্ঠু গরুর মধ্যে প্রবেশ না করা।
৭. আক্রান্ত গরুর খাবার বা ব্যবহার্য কোনো জিনিস সুষ্ঠু গরুর কাছে না আনা।
৮. ক্ষতস্থান টিনচার আয়োডিন মিশ্রণ দিয়ে পরিষ্কার রাখা।

চিকিৎসা
এলএসডি আক্রান্তের লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
আসুন জেনে নিই এর বিস্তারিত চিকিৎসা পদ্ধতিঃ-
Lumpy অর্থ পিন্ড আকার। এ রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত চামড়ার নীচে পিন্ড আকার গোটা গোটা হয়ে থাকে, এটা একটা ভাইরাস জনিত রোগ।
LSD মূলত ইমিউনিটিকে (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) নষ্ট করে দেয়।
LSD কে ইকোনোমিক্যাল রোগও বলা হয়ে থাকে, কারন যদি গুটা গুলো ফেটে যায় তাহলে চামড়ার ক্ষতি হয়ে যায়।
অনেক সময় LSD হলে ওলানে বা যোনির আশেপাশে চাকতির মত গোটা গোটা দেখতে পাওয়া যায় সাথে গরুর পা ও ফুলে যেতে পারে এবং পায়ে, তুতনী ও সীনার নীচে পানিও আসতে পারে।

এছাড়াও মো: মোস্তাফিজুর রহমান এই রোগের চিকিৎসা নিয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। চলুন সেগুলো জেনে আসি।

চিকিৎসাঃ
এটা যেহেতো ভাইরাসজনিত রোগ সেহেতু এর চিকিৎসা রোগের তীব্রতা ও গরুর অবস্থা অনুযায়ী হয়ে থাকে।

যেমনঃ
1) Antibiotic
(Amoxicilin/Penicillin/Oxytetracyclin/Ceftriaxone/Ceftiofur) অবস্থা অনুযায়ী যেকোন ১টা ব্যাবহার করতে হবে।

2) Antihistamin
( Asta vet/Dellergen/Phenadryl) অবস্থা অনুযায়ী যেকোন ১টা ব্যাবহার করতে হবে।

3) জ্বর বেশি তাই অনেক সময় হাটু ফুলে যায় তার জন্য
(Tolfenamic acid/Ketoprofen/Meloxicam+Peracitamol) গ্রুপের ঔষধ
যেমনঃ (Tolfa vet/Keto A vet/ Mel vet plus) অবস্থা অনুয়ায়ী যেকোন ১টা ব্যাবহার করতে হবে।

4) যেহেতু এটা গরুর Immunity কে নষ্ট করে দেয় তাই Immunity বাড়ানোর ঔষধ দিতে হবে-
যেমনঃ (Paw: Fra-C 12/Lysuvit) ইত্যাদি।
এবং সাথে জিংক (Sy: Ozinc vet/Zis vet/Vita Zinc) খাওয়ানো যেতে পারে।

5) যদি পা, তুতনী বা সীনার নীচে পানি আসে তাহলে
Tab: Edecure খাওয়াতে হবে।

6) যদি গোটা ফেটে যায় তাহলে-
(Paw: Sumid vet/Sulfa vet/Nigotox) ইত্যাদি ব্যাহার করতে হবে।

7) অবস্থা অনুযায়ী Ivermectine ব্যাবহার করা যেতে পারে।
যেমনঃ (Inj: Vermic/Amectin) ইত্যাদি।

করনীয়ঃ-
১) শেড পটাশ পানিতে নিয়মিত ভালভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে।
২) আক্রান্ত পশুকে মশারীর মধ্যে রাখতে হবে, যাতে মশা মাছির মাধ্যমে অন্য পশুতে ছড়াতে না পারে।
৩) গরুর ঘর মশা-মাছি মুক্ত রাখতে হবে এবং সপ্তাহে ২দিন জীবানুণাষক দিয়ে পুরো ঘর পরিষ্কার করতে হবে।
৪) গরু LSD আক্রান্ত হলে ভয় না পেয়ে নিকঠস্থ পশু ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস

ফার্মসএন্ডফার্মার/২৯জুন২০