তুলা চাষে সুদিন ফিরছে দক্ষিণের চার জেলায়

16

তুলা চাষের সুদিন ফিরছে যশোরসহ দক্ষিণের চার জেলায়। চলতি বছর যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার কৃষকরা তুলা চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। মূলত ধান, পাট, সবজিসহ অন্যান্য ফসলের চেয়ে তুলা চাষে কম খরচে বেশি লাভবান হওয়ায় কৃষক তুলা চাষের প্রতি ঝুঁকেছেন। সে কারণে চলতি মৌসুমে যশোরাঞ্চলের চার জেলায় রেকর্ড পরিমাণ তুলার আবাদও হয়েছে। তুলার আবাদে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের সংযোজন হওয়ায় একদিকে তুলার ফলন যেমন বেশি হচ্ছে, তেমনি একই ক্ষেতে সাথি ফসল হিসেবে অন্য সবজি আবাদ করে কৃষক দ্বিগুণ লাভ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড যশোর উপপরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর জোনের আওতায় যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাÑএই চার জেলায় চলতি বছর তুলা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমি। সেখানে চাষ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে যশোরে চাষ হয়েছে তিন হাজার ৩৫২ হেক্টর জমিতে।

কৃষকরা জানান, এ বছর তুলা আবাদের জন্য আবহাওয়া অনুকূলে হওয়ায় ফলনও হয়েছে ভালো। বিঘাপ্রতি প্রায় ১৫ মণ তুলা উৎপাদিত হচ্ছে। গত বছরের প্রতি মণ তুলার দাম তিন হাজার ৬০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও এ বছর তা বেড়ে তিন হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করায় তারা বেশ লাভবান হচ্ছেন।

যশোর জোনের খাজুরা অঞ্চলের তুলাচাষি সোহরাব হোসেন বলেন, এ বছর যারা পাট আবাদ করেছেন, তারা চরম লোকসান গুনেছেন। এক মণ পাটের দাম বর্তমান বাজারদর এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। অথচ এক মণ তুলার দাম সেখানে তিন হাজার ৮০০ টাকা। তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে তুলা আবাদে কৃষকের উৎপাদন খরচ লাগে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অথচ সেখানে এক বিঘা জমিতে যে তুলা উৎপাদিত হবে, সেখান থেকে কৃষকের নিট আয় হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, যা অন্য কোনো ফসলে করা সম্ভব নয়।

ঝিনাইদহ জোনের চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ করেছি। আবহাওয়া ভালো হওয়ায় ফলনও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, একই জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করে বাড়তি লাভ করেছি। অথচ এর আগে আমরা পাটসহ অন্য ফসল চাষ করে তেমন একটা লাভ করতে পারিনি। এখন তুলা চাষ ভাগ্যে খুলে দিয়েছে বলে তিনি জানান।

রিয়াজ উদ্দীন নামে আরেক তুলাচাষি বলেন, অন্য ফসলের দাম বাজারে ওঠানামা করলেও তুলার দাম শুরুতে নির্ধারিত থাকে। এ কারণে এ চাষে লস করার কোনো সুযোগ নেই। তুলা ক্ষেতে থেকে ওঠানোর পরই জিনিং ইন্ডাস্ট্রিজের লোকেরা এসে নিয়ে যায়। এতে বাড়তি কোনো ঝামেলা নেই বলে তিনি জানান।

যশোরের হৈবৎ জিনিং ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান মন্টু বলেন, তুলার বিদেশি আমদানি কমাতে সরকারের পাশাপাশি জিনিং অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও কৃষকদের বীজ ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। জিনিং অ্যাসোসিয়েশনের এক একটি জোনের আওতায় কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত তিন হাজার ৮০০ টাকা মণ দরে তুলা সংগ্রহ করা হয়। এসব তুলা নিয়ে কৃষককে দৌড়াদৌড়িও করতে হয় না। এতে কৃষক লাভবান হচ্ছে এবং দিন দিন চাষির সংখ্যা বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড যশোর অঞ্চলের উপপরিচালক ড. কামরুল হাসান বলেন, এ অঞ্চলে তুলা চাষের সম্প্রসারণে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। উচ্চ ফলনশীল নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন এবং তা থেকে বীজ তৈরি করে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ যশোরের চৌগাছার তুলা গবেষণা খামারের বৈজ্ঞানিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা ২০২১-২২ অর্থবছরে দুই টন উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের তুলাবীজ উৎপাদন করে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। আগামী অর্থবছরে তিন টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে বছরে তুলার চাহিদা রয়েছে ৮০ থেকে ৯০ লাখ টন। অথচ আমাদের দেশে উৎপাদিত হচ্ছে বছরে এক লাখ ৮০ হাজার বেল। আট থেকে ১০ লাখ বেল উৎপাদনের টার্গেট নিয়ে কাজ করছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। বিশেষ করে যশোরসহ দক্ষিণের জেলা ছাড়াও পাহাড়ি এলাকায় এ তুলা চাষের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তুলার উচ্চমূল্যের কারণে কৃষককে তুলা চাষে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।