বাংলাদেশে প্রাপ্ত বিভিন্ন জাতের দেশী মুরগী, যে কোন একটি জাত দিয়ে খামার গড়ুন

49

সারা পৃথিবীতে রয়েছে মুরগির নানান জাত। তার মধ্যে আমাদের এই উপমহাদেশে ও রয়েছে নানা জাতের মুরগী। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অনেক আগে থেকেই দেশি মুরগি পালন করা হয়ে আসছে। সাধারনত এরা হালকা ওজনের এবং ছোট আকারের ডিম দিয়ে থাকে।ঐতিহ্য, সুস্বাদু ও গুণগত মাংস ও ডিমের কারণে ওজনে কম হওয়ার পরও এদের মার্কেট ভ্যালু আছে। অঞ্চলভেদে উপমহাদেশে বিভিন্ন দেশি মুরগি দেখতে পাওয়া যায়। নিন্মে উপমহাদেশে প্রাপ্ত কিছু দেশি মুরগির জাতের তথ্য উল্লেখ করা হল।

আসিল মুরগি :

কুমিল্লা জেলার সরাইল, সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলায় এদের উৎপত্তি। এ জাতের মোরগ দেখতে অনেকটা মুরগির মতোই। এরা বেশ বড় হয়। আসিল মুরগি অনেক শক্তিশালী ও কেীশলী। বিশেষ করে লড়াইয়ের মাঠে। লড়াইয়ে দক্ষ বলে এই জাতটির নামকরণ করা হয়েছে আসিল। এরা ফাইটিং কক হিসেবে পরিচিত বিধায় চড়া দামে বিক্রি হয়। লড়াই করে এমন মোরগের মূল্য এক লাখ টাকাও হতে পারে।

আসিল মুরগির গঠন বা আকৃতি :

দের দেহের গঠন বলিষ্ঠ এবং এরা খুব শক্তিশালী। এদের বুক প্রশস্ত। অন্যান্য সাধারণ মুরগির জাতের তুলনায় আসিল মুরগির পা এবং ঘাড় খুব দীর্ঘ। ঠোঁট বেশ বড় ও মজবুত। আসিল মুরগির বিভিন্ন জাত রয়েছে। বৈচিত্রের উপর নির্ভর করে এদের পালকের রঙ কালো, লাল বা মিশ্রিত হতে পারে। এদের মাথা বেশ চওড়া এবং একটি ছোট মটর ঝুঁটি রয়েছে। বেশিরভাগ আসিল মুরগির জাতগুলি আকারে বড় এবং খুব শক্ত। এদের রোগব্যাধি ও বেশ কম হয়ে থাকে।

আসিল মুরগির বৈশিষ্ট্য :
এদের শরীর অত্যন্ত সুঠাম ও সবল।
গলা ও পা লম্বা।

বুক ও উরুতে পালক থাকে।
ডিম কম দেয় এবং ডিম আকারে ছোট ও বাদামি রঙের।
পালকের রং কালো, লাল বা মিশ্র রঙের।

মাথার ঝুঁটি ছোট ও মটর ঝুঁটি।
এরা খুব পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু।
মোরগের গড় ওজন প্রায় 3-4 কেজি এবং মুরগির গড় ওজন প্রায় 2.5-3 কেজি।

চাটগাঁয়ে বা মালয় :

এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলায় এবং মালয়েশিয়া উপদ্বীপে পাওয়া যায় বলে এ জাতটির যথাক্রমে নাম দেওয়া হয়েছে চাটগাঁয়ে এবং মালয়। তাছাড়া উত্তর ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও এ জাতের মুরগি দেখা যায়। মালয় মুরগি একটি কঠোর পালকযুক্ত গেমের পাখির জাত। এটি সবচেয়ে উঁচু মুরগির জাত যা 90 সেন্টিমিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। মালয় মুরগি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে উৎপন্ন সবচেয়ে প্রাচীন মুরগি।

চাটগাঁয়ে বা মালয় মুরগির বৈশিষ্ট্যাবলী :

চামড়া হলুদ ও ডিমের খোসা বাদামি।
মাথায় ছোট মটর ঝুঁটি আছে।

গলা ও ঠোঁট লম্বা এবং মাথা ছোট।
পালকের রং লাল।

লেজের পালক লাল কালোর মিশ্রণ বা সোনালি এবং হালকা হলুদ প্রকৃতির পা লম্বা, মোটা ও ভারী।
এরা দেখতে খুব লম্বা ও মাংসের জন্য ভালো।

লম্বা পায়ের জন্য এদের ডিমের ‘তা’ দিতে বসতে কষ্ট হয়।
মোরগের ওজন 4-4.5 কেজি ও মুরগির ওজন 3-4 কেজি।
মুরগিগুলো মা হিসেবে ভালো নয়, ফলে ছানার ভালো যত্ন নেয় না।

গলাছিলা মুরগি :

গলাছিলা মুরগি একটি পুরানো পোল্ট্রি জাত। প্রাকৃতিকভাবে এর ঘাড় এবং ভেন্ট পালকবিহীন। গলা ছোলা মুরগির উদ্ভব কোথা থেকে হয়েছিলো তা অস্পষ্ট, তবে মনে করা হয় যে, এই জাতটি এশিয়া থেকে নবম শতাব্দির দিকে হাঙ্গেরিয়ানদের দ্বারা ফিরিয়ে আনা হয়েছিলো। এই মুরগির জাতকে টার্কেন, কালেনেক, ট্রান্সিলভেনিয়ান নেকেড নেক মুরগি ইত্যাদি ও বলা হয়। অনেকে এই জাতটিকে মুরগির একটি সংকর এবং টার্কি হিসেবে ভাবেন। তবে এটি সত্য নয়, বরং এগুলি খাঁটি মুরগির জাত। বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়।

গলা ছোলা মুরগির বৈশিষ্ট্যাবলী :

এদের গলায় কোন পালক থাকে না।
চামড়া হলুদ বা লাল রঙের হয়।

পারকের রং সাদা কালোর মিশ্রণ বা লাল।
এদের দেখতে ছোট আকারে টার্কি মোরগ মনে হয়।

ওয়াটিল বেশ বড় ও লাল রঙের।
পা মোটা ও শক্ত।

ডিমের খোসা সাদা।
ডিমে ‘তা’ দেয় এবং বাচ্চার ভালো যত্ন নেয়।

অন্য দেশি মুরগির তুলনায় আগে (180 দিনে) ডিম আসে।
বছরে 90-120 টি ডিম দেয় এবং ডিমের ওজন 40 গ্রাম।
মোরগের ওজন 1.5-2.25 কেজি এবং মুরগির ওজন 1.2-1.5 কেজি।

হিলি মুরগি :

চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাওয়া যায়। এটি সম্পূর্ণ দেশি মুরগির জাত যা মাংস উৎপাদনের দিক থেকে সাধারণ দেশি মোরগ-মুরগি থেকে প্রায় দ্বিগুণ। আর স্বাদের দিক থেকেও অনন্য হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এসব হিলি মোরগ ও মুরগি খুবই জনপ্রিয় এবং স্থানীয় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এসব মোরগ ও মুরগি অন্যান্য দেশি বা বিদেশী মোরগ ও মুরগির তুলনায় 2-3 গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হিলি মুরগির জাত উন্নয়নে কার্যক্রম চলছে।

হিলি মুরগির বৈশিষ্ট্যাবলী :

ডিমের রং হালকা বাদামি।
মোরগের ওজন 2-3.5 কেজি ও মুরগির ওজন 1.5-2 কেজি।

বছরে 80-100 টি ডিম দেয়।
ডিমের ওজন 42 গ্রাম।
দেশি মুরগির মতো একই সময়ে ডিম পাড়া শুরু করে।

ইয়াছিন মুরগি :

এ জাতের মুরগি বাংলাদেশের বান্দরবান ও টেকনাফ এলাকায় পাওয়া যায়। কোন কোন গবেষক মনে করেন যে, শত শত বছর আগে সাদা মোরগ নামে পরিচিত বৃহদকায় এক শ্রেণীর পক্ষিকুলের পালন করা হতো দেয়াঙ পাহাড়ে এবং তার পাদদেশে। দেয়াঙ পাহাড়ের মুরগিগুলো ছিল সাধারণত : দেশীয় মোরগ-মুরগির চেয়ে 5-7 গুণ বড় এবং মোরগের দীর্ঘ পা ও গলা দেখতে অনেকটা ময়ূর আকৃতির ছিল। পরবর্তীতে কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাতে এই সাদা মোরগই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ইয়াছিন মুরগি নামে পরিচিতি লাভ করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুরগির এই জাতটি বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায়। তবে বর্তমানে আবারও বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ইয়াছিন মুরগির জাত উন্নয়নে কার্যক্রম চলছে।

ইয়াছিন মুরগির বৈশিষ্ট্যাবলী :

ডিমের রং হালকা বাদামি।]
মোরগের ওজন 2-3.5 কেজি ও মুরগির ওজন 1.5-2.5 কেজি।

বছরে 60-70 টি ডিম দেয়।
20 দিন বয়সে প্রথম ডিম দেয়।

দেশী মুরগি :

বাংলাদেশের অধিকাংশ মুরগি এ পর্যায়ে পড়ে। কারণ এদের ওজন, গঠন, পারকের রং ও ‍ডিম উৎপাদনে এত বেশি তারতম্য দেখা যায় যে, এদের কোনো বিশেষ জাতের মধ্যে ফেলা যায় না বা এদের কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই।

দেশী মুরগির বৈশিষ্ট্যাবলী :

ডিমের রং চক সাদা।
মোরগের ওজন 1.5-2 কেজি ও মুরগির ওজন 1-1.5 কেজি।
ডিমের ওজন 40 গ্রাম।

বছরে গড়ে 50-60 টি ডিম পাড়ে।
কুচে খাওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান।
ছানার খুব যত্ন করে এবং বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিদেশি জাত অপেক্ষা অনেক বেশি।
এরা বাড়ি বা বাড়ির আশপাশে ছিটিয়ে থাকা খাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করে।

ওজনে হালকা, দেহ সুগঠিত ও পেশি মজবুত।
এদের মাংস ও ডিম উভয়ই সুস্বাদু।
চতুর ও চঞ্চল হওয়ায় শত্রুরা সহজে ধরতে পারে না।

সোনালি মুরগি :

রোড আইল্যান্ড রেড মোরগ ও ফাউমি মুরগির মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে সোনালি জাতের মুরগির সৃষ্টি হয়েছে। এটি একটি সংকর জাতের মুরগি। অনেকে একে দেশি জাতের মুরগি বলে মনে করে। সোনালি মুরগি সব আবহাওয়ার জন্য উপযোগি। উত্তর বঙ্গে বিশেষ করে জয়পুরহাট, বগুড়া, নওগা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি সোনালি পালন করা হয়।

সোনালি মুরগির বৈশিষ্ট্যাবলী :

এদের রোগ বালাই কম হয়।
আমাদের দেশি আবহাওয়ায় সহজে খাপ খাওয়াতে পারে।

দৈহিক ওজন 2-2.5 কেজি।
এরা খুবই চালাক এবং চরে খেতে অভ্যস্ত।

বছরে 200-250 টি ডিম দেয়।
ডিমের ওজন 40-50 গ্রাম।

তথ্যসূত্রঃ পোল্ট্রি জায়ান্ট

ফার্মসএন্ডফার্মার/১৫অক্টোবর২০