বাণিজ্যিকভাবে ইঁদুর পালন করে সফল

28

ইঁদুরের জ্বালাতনে অতিষ্ট হ্যামিলন শহর আর ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’র গল্প নিশ্চয় মনে আছে। তবে সব ইঁদুরই এমন জ্বালাতন করে না। কিছু ইঁদুর মানুষের গবেষণা কাজেও সহযোগিতা করে। সেগুলোর একটি সুইচ অ্যালবিনো প্রজাতির সাদা ইঁদুর। কিছুটা শখ আর প্রাণীর প্রতি

ভালোবাসা থেকে এই ইঁদুরের চারটি বাচ্চা বাড়িতে নিয়ে আসেন সালাউদ্দিন মামুন। উদ্দেশ্য ছিলো বাচ্চাগুলো বড় হলে ছেড়ে দেবেন। কিন্তু দুই মাসের মাথায় অপ্রত্যাশিতভাবে লাভের মুখ দেখতে পাওয়ায় ইঁদুর পালনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। সালাউদ্দিন মামুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ল্যাব সহকারী। তার বাড়ি রাজশাহী জেলার কাটাখালি পৌরসভার সমশেরদীপুর গ্রামে। প্রথমে নিয়ে আসা চারটি ইঁদুরের মধ্যে একটি বাচ্চাকে বিড়াল খেয়ে ফেলে। তবে তিন বছরের মাথায় এখন তার কাছে ইঁদুরের সংখ্যা ১২০টি। গবেষণায় এই সাদা ইঁদুরের বেশ চাহিদা থাকায় দামও ভালো পাচ্ছেন তিনি। স্বপ্ন দেখছেন দেশব্যাপী বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ইঁদুর সরবরাহ করার।

মামুনের ইঁদুর পালন শুরুর গল্পটাও বেশ অদ্ভুত। ২০১৭ সালের শেষের দিকে তিনি সহকর্মী মাসুদের সাথে ল্যাবের সামনে বসেছিলেন। এসময় উদ্ভিদ বিজ্ঞানের এক পিএইডি গবেষক মাসুদকে ইঁদুরের চারটি বাচ্চা দিয়ে সেগুলোকে ছেড়ে দিতে বলেন। ছোট বাচ্চাগুলো দেখে মায়া হয় মামুনের। কিছুদিন রেখে বড় হলে ছেড়ে দিবেন এ ভাবনা থেকে বাচ্চাগুলো বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। তখনও জানতেন না ইঁদুর বাচ্চাগুলোকে কী খাওয়াতে হবে।

সালাউদ্দীন মামুন জানান, বাড়িতে এনে ইঁদুরগুলোকে তিনি জুতা রাখার বাক্সে কাপড় দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। খাবার হিসেবে কিছু চাল, গম দিতেন। এরই মধ্যে বিড়াল একটি ইঁদুরের বাচ্চা খেয়ে ফেলে। তিনি বাকি তিনটাকে বিড়ালের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যবস্থা নেন এবং নিয়মিত খাবারও দিতে থাকেন। মাস খানেক পর একটি ইঁদুর ১০টা বাচ্চা জন্ম দেয়। তার সপ্তাহখানেক পরে আরও একটি ইঁদুর ১০টা বাচ্চা দেয়।

শখ থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার ব্যাপারে মামুন বলেন, ‘ইঁদুরের বাচ্চা দেওয়ার বিষয়টি আমি বিভাগে গল্প করি। এসময় জামার্নির এক গবেষক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মিউজিয়ামে ট্যাক্সিডার্মি নিয়ে কাজ করছিলেন। তার গবেষণার জন্য আমার কাছে ইঁদুরগুলো চাইলেন। ইঁদুরগুলো মেরে ফেলবে, তাই দিতে রাজি হইনি। পরবর্তীতে মিউজিয়ামের কিউরেটর আমাকে বুঝিয়ে বললেন। তখন আমি তাকে ২০টি ইঁদুর দিলাম। তিনি আমাকে ১ হাজার টাকা দিলেন। টাকা পেয়ে আমি কিছুটা অবাকই হলাম। এরপরই মূলত ইঁদুর পালনে আগ্রহী হয়ে উঠলাম এবং কিছুটা পড়াশোনও শুরু করলাম।’

সালাউদ্দিন মামুন এখন তার নিজ বাড়ির একটি ঘরে ইঁদুর পালন করছেন। সাপ, বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীদের থেকে রক্ষা করতে কক্ষের চারদিকে নেট লাগানো হয়েছে। ইঁদুরগুলোকেও নিয়মিত চাল, গম, ভূট্টা, ডাল জাতীয় খাবার খাওয়ানো হয়।

বর্তমানে তার খামারে ১০০টি স্ত্রী ও ২০টি পুরুষ ইঁদুর রয়েছে। প্রত্যেকটি স্ত্রী ইঁদুর এক থেকে দেড় মাস পরপর ৮-১০টি বাচ্চা দেয়। শুরুর দিকে কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণার জন্য তার কাছ থেকে ইঁদুর কিনতেন। তবে বর্তমানে রাবি ছাড়াও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার একাধিক ফার্মাসিউটিক্যাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার খামার থেকে ইঁদুর নিয়ে যাচ্ছেন।

ব্যতিক্রমী এই খামারি বলেন, ‘কোভিড-১৯ এর ভ্যাক্সিন তৈরির চেষ্টা করছেন এমন একটি নামকরা দেশীয় প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আমার কাছ থেকে ৫০টি ইঁদুর নিয়েছেন। অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানই নিয়মিত ইঁদুর নিচ্ছে। প্রথম দিকে একেকটি ইঁদুর ৪০ টাকা করে বিক্রি করতাম। বর্তমানে একটি ইঁদুর ৭০ টাকা হারে বিক্রি করছি।’

গবেষকরা বলছেন, বায়োলজিক্যাল ও বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সের যেকোনো গবেষণা কাজের প্রাথমিক ধাপে পরীক্ষার জন্য সুইচ অ্যালবিনো প্রজাতির এই ইঁদুর ব্যবহার করা হয়। তবে বাংলাদেশে শুধু আইসিডিআরবি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঁদুরের চাষ করা হয়। যা প্রয়োজনের তুলনা অনেক কম। ইঁদুরের খামার করতে আগ্রহীদের সরকারীভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলে গবেষণা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে মনে করছেন তারা।

সালাউদ্দীন মামুনের খামার থেকে ইঁদুর নিয়ে গত দুই বছর যাবত গবেষণা করছেন রাজশাহী জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আবু রেজা। তিনি বলেন, ‘ইঁদুরে জিনের সাথে মানুষের জিনের বেশ মিল থাকায় গবেষণার প্রাথমিক ধাপে অ্যালবিনো প্রজাতির ইঁদুরের বেশ চাহিদা রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে ইঁদুর পালনে আগ্রহীদের সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তা বাংলাদেশের গবেষণাখাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।’
ইঁদুরের বংশ বিস্তার নিয়ে কাজ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদ। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি উদ্যোগে ইঁদুর পালন এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সালাউদ্দিন মামুন যেহেতু বাণিজ্যিকভাবে পালন করার চিন্তাভাবনা করছেন সেক্ষেত্রে বাসস্থান, খাবার ও তাপমাত্রা এসব বিষয়গুলো আরও বৈজ্ঞানিকভাবে করা উচিত। সেক্ষেত্রে তার কোনও ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমি তা দিতে প্রস্তত।’

ইঁদুর নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছে আছে জানিয়ে সালাউদ্দীন মামুন বলেন, ‘শুধু রাবি বা বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ইঁদুর সরবরাহ করার ইচ্ছে আছে। আমি ইতোমধ্যে একটি বড় ঘর তৈরি করেছি। সেখানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ইঁদুর পালন করবো। এছাড়া ইউরোপে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এমন প্রাণী বাংলাদেশে এনে বংশবিস্তার ঘটানোর ইচ্ছে আছে।’

ফার্মসএন্ডফার্মার/০৬নভেম্বর২০২০