বিলুপ্তির পথে মাটির তৈরি সামগ্রী

75

প্লাষ্টিক তৈরির সামগ্রীর দাপটে শেরপুরে মাটির তৈরির সামগ্রীর কারিগর বা মৃৎশিল্পীদের দুর্দিন চলছে। নেই আগের মতো বেচা-বিক্রি। মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, খেলনাসহ অন্যান্য সামগ্রী প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও কেবল মাত্র দই ও ফুলের টব তৈরি করা হলেও এখন মাত্র দইয়ের পাতিল তৈরি করে কোনো রকমে জীবনযুদ্ধে টিকে আছেন তারা। তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এ পেশায় সংযুক্ত না করে নিয়ে যাচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন পেশায়। একসময় বিনা মূল্যে মাটি পেলেও এখন উচ্চ মূল্যে মাটি কিনে এবং অন্যান্য খরচ করে মাটির সামগ্রী তৈরিতে পোষাচ্ছে না তাদের। তার পরও বাবা-দাদার ঐতিহ্যবাহী পৈতৃক এ পেশা ধরে রেখে কোনো রকমে টিকে আছেন তারা।

একসময় দেশের সর্বত্র মৃৎশিল্পী বা কুমারদের সোনালি দিন ছিল। বছরজুড়ে থাকত কুমারবাড়ি বা পালপাড়াতে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খাদা (প্লেট) কলসি, জগ, গ্লাস, গো-খাদ্যের চাড়ি, মুড়ি ভাজার পাতিলসহ নানা আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী তৈরির জমজমাট কর্মযজ্ঞ। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক সামগ্রীর দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে মাটির তৈরি কুমার বা পালদের তৈরি হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা সামগ্রী। শেরপুর জেলার সদর উপজেলার পৌর এলাকাসংলগ্ন ভাতাশালা ইউনিয়নের বয়ড়া পালপাড়ায় প্রায় ৬০ বছর আগে মাত্র পাঁচ-ছয় ঘর পাল (কুমার) বা মৃৎশিল্পী টাঙ্গাইল থেকে এসে বসতি গড়েন। একপর্যায়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ব্যবসা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। পাঁচ-ছয় ঘর থেকে তারা বর্তমানে শতাধিক ঘর বা পরিবার হয়ে ওঠে ওই পালপাড়ায়। কিন্তু প্রায় ১০ বছর ধরে প্লাস্টিক সামগ্রীর কারণে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিলসহ অন্যান্য মাটির সামগ্রীর কদর কমে আসে। তিন-চার বছর আগেও কেবল মিষ্টি ও দই এবং ফুলের টবের কিছুটা চাহিদা থাকলেও এখন কেবল দইয়ের পাতিল ছাড়া কেউ আর পালপাড়ায় আসে না, বা তাদের তৈরি সামগ্রী কেনে না। ফলে তাদের সে জৌলুস আর নেই। হারিয়ে গেছে তাদের ব্যস্ততা। হারিয়ে গেছে তাদের মুখের হাসি।

অবশিষ্ট এখনও যারা এ পেশার সঙ্গে জড়িত আছে, তারাও মাটি ও বিভিন্ন সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে সেসব পণ্য তৈরিতেও লাভের মুখ দেখতে পারছেন না। তারপরও বাবা-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছেন তারা। এ পেশা থেকে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয় বলে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে অন্য পেশায় নিয়োগ করেছেন অনেকেই।

এ বিষয়ে পালপাড়ার রমেন পাল জানান, একসময় গরুর চাড়ি ও ধান-চাল রাখার মটকা নেয়ার জন্য কৃষকরা পালপাড়ায় এসে বসে থাকতেন। কোনো রকমে কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা এসব জিনিসপত্র নিয়ে যেতেন। আমরাও এসব জিনিসপত্র তৈরি করার সময় পেতাম না। সেসময় আমাদের খুব কদরও ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক সামগ্রীর কারণে আমাদের আর কদর নেই। ঘরের ভেতর ও বাড়ির উঠোনে সারি সারি হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে রাখলেও কেউ নিতে আসে না।

বিসিকের শিল্পনগর কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান ফকির জানান, আমাদের পক্ষ থেকে মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং মৃৎশিল্লীদের জন্য আর্থিক অনুদান না থাকলেও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের সঙ্গে যোগগাযোগ করলে তাদের এ সুবিধা দেয়া হবে।