বোরো উৎপাদনে নিরাপদ কৌশল পার্চিং

49

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি কৃষির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষির উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। আর সে উন্নয়ন অভিযাত্রায় বালাইয়ের আক্রমণ ও ক্ষতি মুক্ত কৃষিই আমাদের কাঙ্খিত। রোগ পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক দমন পদ্ধতি ব্যবহারের চেয়ে জৈবিক দমন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রহণযোগ্য। অনেক জৈবিক দমন পদ্ধতির মধ্যে পার্চিং আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। পরিবেশবান্ধব ধান উৎপাদনে পার্চিং বেশ কার্যকর এবং লাভজনক। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে এ কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে নির্বিঘ্নে বোরো উৎপাদনে সুবিধা পাওয়া যায়।

পার্চিং (Perching)
পার্চিং একটি ইংরেজি শব্দ, মানে ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে দেয়া। ফসলের জমিতে ডাল, কঞ্চি, বাঁশের খুঁটি এগুলো পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ক্ষতিকারক পোকার মথ, বাচ্চা, ডিম খেয়ে পোকা দমন করে। পোকা দমনের এ পদ্ধতিকে পার্চিং বলা হয়। ফসলের পোকা দমনের এ পদ্ধতি অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল বলতে গেলে ব্যয়বিহীন এবং পরিবেশবান্ধব। পার্চিং দুই প্রকরের। ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। মরা ডালপালা পুঁতে দিলে তা হবে ডেড পার্চিং এবং ধইঞ্চা, অড়হর এসব জীবন্ত জমিতে পুঁতে দিলে তা হবে লাইভ পার্চিং।

১| ডেড পার্চিং (Dead Perching):
খুঁটির গোড়ালিতে বা নিচের অংশে গিড়া রেখে ৬-৬.৫ ইঞ্চি লম্বা করে বাঁশের খ- কাটতে হবে। খণ্ডের নিচের দিকে গিড়া থাকলে কেউ সহজে খুঁটি তুলতে পারবে না। খুঁটির নিচের অংশে ২-২.৫ ইঞ্চি লম্বা বাঁশের ফালি তারকাটা দিয়ে আড়াআড়িভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। খুঁটির নিচের অংশে সুচালো বা চোকা করা যাবে না। সুচালো করলে অন্য কেউ সহজে তুলে নিয়ে যাবে। প্রতিটি বাঁশ খ- থেকে ১২-১৮টি ফালি বা খুঁটি হবে। খুঁটি বেশি মোটা করলে চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই যথাসম্ভব বাঁশের বাতার খুঁটি পাতলা করতে হবে। খুঁটি বা ফালির আগায় প্রায় ১০-১২ ইঞ্চি সেকশন করে চারটি ফালি তুলতে হবে। ১০-১২ অংশের সেকশন সুতলির সাহায্যে নিচের দিকে এমনভাবে হেলে আনতে হবে যেন পাখি আরামে বসার উপযোগী হয়। একটি সুচালো ও শক্ত বাঁশের ফলা দিয়ে অথবা শাবলের সহায়তায় ৮-১০ ইঞ্চি গভীর করে গোড়ার আলসহ পার্চিং নরম মাটিতে পুঁতে দিতে হবে। মাটি একটু শক্ত হলে বা জমে গেলে সে পার্চিং অন্য কেহ সহজে তুলে নিতে পারবে না। এতে করে পার্চিং চুরি বন্ধ হবে।

পার্চিং টিকে চুনের দ্রবণে চুবালে অনেকটা ধবধবে সাদা দেখাবে এবং ক্ষেতের অনেক দূর থেকে দৃষ্টিগোচরে আসবে। চুনের পরিবর্তে সাদা পেইন্ট দিয়েও পার্চিংয়ের ওপরের অংশকে রঙ করা যাবে। আর মাটিতে পুতার অংশে আলকাতরা দিয়ে লেপে দিলে খুঁটির স্থায়িত্ব বেশি হয়। রঙ বা সাদা না করেও পাখি বসানোর ব্যবস্থা করা যায়। পার্চিং আইল থেকে বেশ দূরে দেয়াই ভালো এবং জমির যে অংশে চলাচলের অসুবিধা আছে সেখানে স্থাপন করা ভালো। পার্চিংয়ের খুঁটি সরাসরি মাটিতে না পুঁতে একটি শাবল বা সুচালো অন্য কোনো কিছু দিয়ে চাপা গর্ত করে সেখানে গভীরভাবে স্থাপন করে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থার জন্য এক বিঘা জমিতে ৬-৮ টি পার্চিং দিতে হবে। আগের কৌশলের মতো খুঁটি তৈরি করে তার ওপরের অংশে ডালের আগা, ছোট ঝোপ ঝাড়ের কর্তিত অংশ এবং শুকনা মরিচ গাছ, শুকনা বেগুন গাছ বা শাখা বা কঞ্চি বেঁধে দিতে হবে। ডাল বা কঞ্চি লম্বালম্বিভাবে না বেঁধে আড়াআড়িভাবে বেঁধে দিলে পাখি বসতে সুবিধা হবে। ডাল/কঞ্চি/ঝাড় অন্তত ২-৩ টি স্থানে বাঁধন দিতে হবে। অনেক দূর থেকে তা দৃষ্টিগোচরে আসবে।

২| লাইভ পার্চিং (Live Perching) :

লাইভ পার্চিং বা আফ্রিকান ধৈঞ্চা (Sesbania rostrata) দিয়ে পার্চিং এর ব্যবস্থা করা যায়। দেশি ধৈঞ্চা দিয়েও লাইভ পার্চিং করা যায় তবে দেশি ধৈঞ্চার পার্চিং বেশির ভাগ ক্ষেতে মারা যায়। তাছাড়া অড়হর দিয়ে ও লাইভ পার্চিং করা যায়। অড়হরও বেশ কয়েক বছর টিকে থাকে। ৪০-৪৫ দিন বয়সের আফ্রিকান ধৈঞ্চার গাছ থেকে প্রতি গাছে ২-৩টি প্রায় ২.৫-৩ ফুট লম্বা সাইজের কাটিং নিতে হয়।

ধান রোপণের ২-৩ দিনের মধ্যে আফ্রিকান ধৈঞ্চার কাটিং লাগাতে হয়। ৩ দিনের বেশি বিলম্ব হলে সফলতার হার ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। রোদের সময় কাটিং না লাগিয়ে বৃষ্টির সময় লাগালে সফলতার হার বাড়বে। লাইভ পার্চিং ঝোপালো হলে পরিমিত ছাঁটাই করে দেয়া দরকার। এক বিঘা জমিতে ৬টি লাইভ পার্চিং করা দরকার। আমন ধান কাটার সময় পার্চিংয়ের আফ্রিকান ধৈঞ্চার বীজ পরিপক্ব হয়। তাই ধান কাটার সময় এবং বীজ সংগ্রহ করে ভালোভাবে শুকিয়ে পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। আমন মৌসুমের মতো বোরো মৌসুমেও আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশি ধৈঞ্চা দিয়ে লাইভ পার্চিং করা সম্ভব। তবে কাটিংয়ের সফলতার হার খুবই কম। তাই এ কাজে পলিব্যাগে তৈরি ধৈঞ্চার চারা দিয়ে লাইভ পার্চিং করলে ফল বেশি ভালো হয়। বোরো মৌসুম বা শীতকালে লাইভ পার্চিং করার জন্য আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশি ধৈঞ্চার পুরনো বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। আমন ধান ক্ষেতে স্থাপিত আফ্রিকান ধৈঞ্চার আর্লি ফ্লাস থেকে নভেম্বর মসের ১ম সপ্তাহে পরিপক্ব নতুন বীজ পাওয়া যায়।

পলিব্যাগে পট মিক্সার ভরে প্রতি ব্যাগে ১-৩টি বীজ দিতে হবে। পলিব্যাগে বীজ দেয়ার সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো উপায়ে নভেম্বর মাসের ১০ তারিখের আগে পলিব্যাগে বীজ দিতে হবে। বীজ বুনতে দেরি করলে চারার বাড়বাড়তি থেমে থাকবে। বীজ বোনার পর পলিব্যাগ রোদে রাখতে হবে এবং পানি দেয়াসহ সব যত্নাদি যথানিয়মে নিতে হবে। ২৫ নভেম্বের থেকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে চারাকে কমপক্ষে ১০-১৪ ইঞ্চি বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিসেম্বরে চারার বৃদ্ধি না হলেও গাছে ফুল আসবে সে ফুল ভেঙে দেয়া ভালো হবে তবে ফুল ভেঙে না দিলেও চলবে। ১০-১৪ ইঞ্চি সাইজের চারা ব্যাগসহ ব্যাগের তলা সামান্য কেটে দিয়ে বোরো ধান রোপণের পর যথা সম্ভব তাড়াতাড়ি লাগাতে হবে। শীতে চারার বৃদ্ধি কিছুটা কমে থাকলেও, শীত কমার সাথে সাথে চারার বৃদ্ধি শুরু হবে।

ফার্মসএন্ডফার্মার/২১ফেব্রুয়ারি২০২১