যেসব কারণে লাভজনক ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল

33

ছাগলের মধ্যে দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতটি বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনের অনেক সুবিধা রয়েছে। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম উৎস এই ছাগল পালন। এছাড়া বর্তমানে অনেক বেকার যুবক দেশি ব্লাক বেঙ্গল পালন করে বেকারত্ব দূর করছেন।

ছাগলের বিভিন্ন জাত রয়েছে যেমন অ্যাংগোরা, বারবারি, বিটাল, যমুনাপারি, ব্ল্যাক বেঙ্গল, সুরতি, মারওয়ারি, মালবারি, গাড্ডি, কাশ্মীরি, পশমিনা, সানেন, টুগেনবার্গ, অরপাইন, মোহসানা, ফিজি, অ্যাংলোলু প্রভৃতি। এদের মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল বিশ্বসেরা। বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের পশ্চিম বাংলা, আসামসহ কয়েকটি প্রদেশে পাওয়া যায় এ ধরনের ছাগল।

ব্ল্যাক বেঙ্গলের মাংস খেতে সুস্বাদু, চামড়াও উন্নতমানের। এদের গড় ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি। তবে অনেক সময় ৩২ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। দৈনিক ওজন বৃদ্ধির হার ২০ থেকে ৪০ গ্রাম। সংগত কারণে একজন খামারি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এ ছাগল পালন করে বাড়তি আয় করতে পারেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় খামারির জন্য ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন নিশ্চিত লাভজনক।

এ প্রজাতির ছাগলের বাচ্চা উৎপাদন ক্ষমতা বেশি। বছরে দুবার ও এক সঙ্গে একাধিক বাচ্চা দেয়। স্ত্রী ছাগল ৯ থেকে ১০ মাস বয়সে প্রজননের উপযোগী হয়। ১৪ থেকে ১৫ মাস বয়সে প্রথম বাচ্চা প্রসব করে। দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে বলে অল্প সময়ে লাভের মুখ দেখা যায়। এ ধরনের ছাগল পালনে অল্প জায়গার প্রয়োজন পড়ে। পরিবারের যে কোনো সদস্য এর দেখভাল করতে পারেন। তাছাড়া অন্যান্য পশুর মতো গোচারণভূমির প্রয়োজন পড়ে না। ঘাস লতাপাতা খেয়ে জীবনধারণ করতে পারে। অর্থাৎ অল্পপুঁজিতে লালন পালন করা যায়। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল তুলনামূলক কম দুধ দেয়। তবে এ দুধ খুবই পুষ্টিকর ও এলার্জি উপসর্গ উপশমকারী বলে স্বীকৃত। এছাড়া এদের মৃত্যুর হারও অন্য জাতের তুলনায় কম।

নিয়ম মেনে সঠিকভাবে পালন করা উচিত। এ ধরনের ছাগলকে দুই ধরনের খাদ্য খাওয়ানো উচিত। এর মধ্যে প্রথমে রয়েছে আঁশ জাতীয় খাবার। মুক্তচারণ পদ্ধতিতে পালন করলে ছাগল নিজেই তার পছন্দ ও প্রয়োজনীয় আঁশ জাতীয় খাবার খেতে পারে। তবে মুক্তচারণ পদ্ধতি বিফল হলে পরিকল্পিতভাবে আঁশযুক্ত খাবার সরবরাহ করতে হবে। আঁশযুক্ত খাবার হিসেবে বিভিন্ন গাছের পাতা ও সবুজ ঘাস দেওয়া যেতে পারে। আঁশযুক্ত খাবারের জন্য নেপিয়ার, আলফালফা, শিম, ইপিল ইপিল, কাঁঠালগাছ রোপণ করতে পারেন। এরপরে দিতে হবে দানাদার খাবার। শুধু আঁশযুক্ত খাবারে ছাগলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। আশানুরূপ উৎপাদন পাওয়ার জন্য আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে দানাদার খাবার দিতে হবে। খাবার যাই-ই প্রয়োজন হোক না কেন যে কোনো দানাদার খাবারের মিশ্রণে শতকরা হারে চাল, ভুট্টা ও গমের ভুষি ৪৫ ভাগ, চালের কুঁড়া ২০ ভাগ, খেসারি ভাঙা ১৮ ভাগ, তিলের খৈল ১৬ ভাগ, লবণ শূন্য দশমিক ৯ ভাগ, এমবাভিট শূন্য দশমিক এক ভাগ হতে হবে। এ খাবারের মিশ্রণে যেন ১৬ ভাগ অপরিশোধিত আমিষ থাকে। তা হলে এটি সুষম খাবার হবে। দানাদার খাবারের মধ্যে চালের ক্ষুদ ও কুঁড়া, গম ও ভুট্টা চূর্ণ, গমের ভুষি, ছোলা ও খেসারি ভাঙা, সরিষার খৈল, তিলের খৈল, ভিটামিন, শুঁটকি গুঁড়া, খনিজ ও আয়োডিনযুক্ত লবণ প্রভৃতি খাওয়ানো যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণ আঁশযুক্ত খাবার সুবিধামতো সময়ে দিনে দুবার দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে একটি প্রাপ্ত বয়স্ক ছাগীকে প্রতিদিন ১৬০ গ্রাম অর্ধেক করে সকালে ৮০ গ্রাম ও বিকালে ৮০ গ্রাম খাওয়াতে হবে দানাদার খাবার। সঙ্গে দিতে হবে বিশুদ্ধ পানি। ছাগলের ঘরের কাছে যেন বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ছাগল পালনের জন্য বাসস্থান তৈরি খুব জরুরি। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে মুক্তচারণ পদ্ধতিতে ছাগল পালন করা বলে দিনের বেলায় বাসস্থানের জন্য চিন্তা করতে হয় না। রাতে নিরাপদে রাখলেই চলে। তবে আলাদা ঘর নির্র্মাণের সময় অবশ্যই উঁচু স্থান যেখানে বৃষ্টির পানি জমে না ও পর্যাপ্ত আলো বাতাস পাওয়া যায় তেমন জায়গা নির্বাচন করতে হবে। স্যাঁতস্যাঁতে ও ভেজা জায়গায় ছাগল পালন সম্ভব নয়।

নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। এর মধ্যে রয়েছে সংক্রামক রোগ, পরজীবীজনিত রোগ, অসংক্রামক রোগ, অপুষ্টিজনিত রোগ, বিপাকীয় রোগ প্রভৃতি।

ব্ল্যাক বেঙ্গলের চাহিদা বেশি

প্রাচীনকালের অনেক দেশীয় প্রাণিসম্পদ কালের পরিক্রমায় আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। এখন অল্পসংখ্যক প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যা গ্রামের মানুষের লালন-পালনের মাধ্যমে টিকে আছে। এদের মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল, মুরগি, হাঁস ও কবুতর। এর মধ্যে ছাগল পালনে অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। ছাগলকে বলা হয় গরিবের গাভী। তবে ছাগলের কিছু জাত রয়েছে। তার মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত।

জাতিসংঘের আণবিক শক্তিবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ৯ বছর বিভিন্ন জাতের ছাগলের ওপর গবেষণা করে ২০০৭ সালে ব্ল্যাক বেঙ্গলকে অন্যতম সেরা জাত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এফএও এবং আইএইএ’র গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরাও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলকে সবার সেরা বলেছেন।

বাংলাদেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি সরবরাহ বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অন্যতম হচ্ছে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।
বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, অন্যান্য জাতের ছাগলের চেয়ে ব্ল্যাক বেঙ্গলের মাংসের স্বাদ খুবই ভালো ও পুষ্টিকর। এর চামড়া এত উন্নতমানের যে, বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে এটি ব্যবহƒত হয়। এ কারণে আমাদের দেশে এর চাহিদা বেশি। শুধু দেশেই নয়, বিশ্ববাজারেও এর চাহিদা বেশি।

ব্ল্যাক বেঙ্গলের জন্য আলাদা কোনো জায়গার দরকার পড়ে না। বাড়ির উঠান কিংবা রান্নাঘরের ছোট একটি স্থানই এদের জন্য যথেষ্ট। খুব কম সময়ই যে কোনো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে তারা। এ জাতের ছাগলের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় সহজে রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হয় না। অন্যান্য ছাগলের তুলনায় এরা কম লম্বা হয়। দুধও দেয় অল্প পরিমাণ; পরিমাণে অল্প হলেও এর পুষ্টিমান অতুলনীয়। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের দুধ যক্ষ্মা ও হাঁজলের মতো চর্মরোগে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

কৃষকরা তাদের সামর্থ্যরে মধ্যেই ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল উৎপাদন করতে পারেন। বাজারে এর চাহিদা বেশি থাকায় কৃষক বা সাধারণ মানুষ বিক্রি করে খুব সহজে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। কেননা, এতে লোকসানের কোনো ভয় থাকে না।