শীতে গবাদিপশুকে নিরাপদ রাখতে করনীয়

71

খামারী ভাইয়েরা প্রতি বছর শীত মৌসূমে তাদের গবাদী পশু নিয়ে প্রচন্ড শীতের কবলে পড়ে এবং তা মোকাবেলা করতে হীমশিম খায়। খামারের পশুপাখি গুলো বিভিন্ন ঠান্ডা জনিত অসুখে আক্রান্ত হয় এবং অনেকক্ষেত্রে মৃত্যুও হয়। পশু পালনে অভিজ্ঞ খামারীরা শীত থেকে পশু গুলোকে রক্ষা করতে পারলেও নতুন খামারী বা অনাভিজ্ঞরা বিভিন্ন সমস্যা পড়ে। অভিজ্ঞ খামারী জহীর ভাই তার খামারে তীব্র শীত থেকে এবং শীত জনিত রোগ থেকে পশুগুলোকে রক্ষা করার জন্য ৪ বছরের মধ্যে সবচাইতে যে নিয়মে সফল হয়েছে তা তিনি সংক্ষেপে উল্লেখ সহ আরও কিছু নিয়ম খামারীদের জন্য দেওয়া হল।

পশুগুলো নিরাপদে রাখতে :-
১। মাঁচা:- ছাগল, ভেড়া, গাড়ল পালন করতে হলে শীত বা গরমে কোন অবস্থায় পাকা ফ্লোর বা মাটিতে সরাসরি পশু গুলোকে রাখা যাবে না। (যেখানকার আবহাওয়া গরম এবং বৃষ্টিপাত কম তাদের ক্ষেত্রে ব্যাতিরেকে) যাদের পক্ষে আধুনিক সেড করা সম্ভব হবে না বা কম পশু পালন করেন তারা কাঠের তৈরি পাটাতন ব্যবহার করতে পারেন। অথবা বিশেষ প্রয়োজনে বাঁশের মাচা ব্যবহার করতে পারেন। যেটা থেকে খামারের পশু গুলিকে মাটির স্পর্শ থেকে রক্ষা করতে পারবেন। অনেকে পাটের বস্তা বা খড় মাটিতে দিয়ে রাখেন এটি করলে খরচ বেশি এবং ঐ গুলো ভিজে আরো ঠান্ডা লাগবে সুতরাং শীতে প্রথমে ছাগল গুলোকে যেন রাতের বেলাতে মাটি বা ফ্লোরে না থাকে এই ব্যাবস্থা করতে হবে। এবং গরুর ক্ষেত্রে ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
শীতেঃ খামারের চারিদিকে চটের বস্তা দিয়ে ঘিরে রাখতে হবে, যাতে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে না পারে। অতি ঠান্ডায় ছাগলের শরিরে উলের জামা পরিধান করে দিতে পারেন। মাচায় দুই/পাঁচ ইঞ্চি পুরু করে খড় বিছিয়ে দিতে হবে।

২। খাবার:- শীতে পশুর খাবার দিকে স্পেশাল নজর দিতে হবে। কাঁচা ঘাস আগে যেমন দেওয়া হত তেমন দিতে পারেন। অনেকেই শীতের দিনে পানি খাওয়ানো একদম বন্ধ করে দেন এটি ঠিক না শীতে পানি দিতে হবে এবং অবশ্যই হাল্কা কুসুম গরম পানি দিবেন আর পানি বেশি সময় দিয়ে রাখবেন না এতে ঠান্ডা হবে পানি, আর ঠান্ডা পানি পান করলে আরো ঠান্ডা লাগবে। পানির সাথে ৩-৪ ঘন্টা ভিজিয়ে সরিষার খৈল শুরু থেকে অল্প অল্প করে অভ্যাস করান শরিষার খৈলে অধিক প্রোটিনের কারনে শরীর গরম থাকবে। সাথে গমের ভূষি এবং সাদা মটরের ভূষি মিক্সট দিতে পারেন খাবারে আগ্রহ হবে এবং চিটাগুড় মিশিয়ে পানি দিবে এতে রুচি এবং হজম শক্তি বাড়বে। যদি কারো ছাগল পানি পান করতে না চায় তবে আস্তে আস্তে উপরে ৩টি জিনিস মিশিয়ে অভ্যস্ত করাতে পারেন অথবা পানি ছাড়া হাল্কা ভেজা ভেজা মিশিয়ে দিতে পারেন তবে সরিষ খৈল ৩-৪ ঘন্টা ভিজিয়ে দিতে হবে। শুকনা দিলে আপনার পশু ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

৩। ভিটামিন :-তীব্র শীতে পশু গুলোর শরীর গরম রাখার জন্য এবং ধকল কাটিয়ে উঠতে ২-৩ মাস একটু নিয়মিত ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, মিনারেলস, ইত্যাদির যোগান সঠিক ভাবে দিতে হবে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম টা দিতে হবে এছাড়া প্রতি ১০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য হিসেব করে প্রতিটি পশুকে ১ এমএল করে ভিটামিন এডিই৩ সিরাপ একটানা ৫ দিন উপরের খাবারে নিয়ম দেওয়া আছে তার সাথে দিতে হবে এবং কোন অবস্থায় যেন মাত্রা বেশি না হয় এর বেশি হলে পাতলা পায়খানা হবে। এ ডি ই দিলে উক্ত ভিটামিনের চাহিদা পুরণ করবে এবং শরীর গরম রাখবে। এর পর ৫ দিন বিরতি দিয়ে দিয়ে জিংক, ভিটামিন বি+সি, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি দিবেন। তবে অবশ্যই এ ডি ই৩ এই শীতের ৩ মাস নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে, ডিসেম্বর, জানুয়ারী, ফেব্রæয়ারীর মাঝামাঝি পর্যন্ত মাসে যেন ৩০ দিনের মধ্যে ২ বার ৫দিন, ৫দিন ১০ দিন পরে দিতে হবে।

৪। ব্র্রুডি (তাপের) ব্যবস্থা:- আমাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন উপায়ে খামারে তাপের ব্যবস্থা করেন। কেউ হিটার, কেউ ক্লিয়ার বাল্ব ১০০-২০০-৫০০ ওয়াটের ব্যবহার করে থাকেন। সরাসরি বেশি ওয়াটের হিটার ব্যবহার করলে অনেক বিদুৎ খরচ লাগে এবং খামারের সকল জায়গাতে একসাথে তাপ পৌছাতে পারে না । আবার অনেকে সরাসরি ক্লিয়ার বাল্ব ব্যবহার করার কারনে খামারে রাতের বেলাতে প্রচুর আলো হয়। মনে রাখতে হবে ছাগল খুব চঞ্চল প্রাণী দিনে ছুটাছুটির ধখল কাটাতে রাতে প্রচুর বিশ্রাম প্রয়োজন। কিন্তু রাতে খামারে অতিরিক্ত আলো থাকলে কিছু কিছু পশু দৌড়াদৌড়ি, চলাফেরা করে এবং যে যে পশু বিশ্রাম নেয় তাদের বিরক্ত করে এতে পশুগুলো সঠিক ভাবে বিশ্রাম নিতে এবং ঘুমাতে পারে না এর প্রভাব খুব মারাত্বক হয়। এছাড়া পশুর অতিরিক্ত আলোর কারণে জনতন্ত্রের প্রলেপ্সও দেখাদিতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে পেট ব্রæডার বাল্ব ব্যবহার করতে পারেন যা আলোবিহীন তাপ দেবে। যদিও পেট ব্রæডার ইনফ্রারেড বাল্ব হুবহু পাওয়া যায়না তবে অনলাইনে সহজে সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতি ১০০ স্কয়ারফিট ঘরের জন্য ১ টি ১০০ ওয়াটের পেট ব্রæডার ইনফ্রারেড বাল্ব যথেষ্ট বলে পরিক্ষীত। বাল্ব গুলো মধ্যে বরাবর রাখবেন তাহলে তার চতুর্থ পার্শ্বে যাবে। স্কয়ারফিট হিসেব বের করবেন ঘর যদি ১০ ফুট বাই ২০ ফুট হয় তখন দৈর্ঘ গুনন প্রস্ত ১০ গুনন ২০ অর্থাৎ ২০০ স্কয়ার ফিট।
যাদের এলাকাতে বিদুৎ নাই তারা আপনাদের এলাকাতে কোন পোল্টি খামার পরিদর্শন করেন এবং দেখেন তারা কিভাবে হারিকেন বা চুলা দিয়ে ব্রæডিং করে তাপ দেয় ঐ নিয়মে আপনার ছাগলের খামারে তাপের ব্যবস্থা করতে পারবেন। ফেব্রæয়ারীর শুরুর দিকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলেও গভীর রাতে খেয়াল করবেন অনেক ঠান্ডা থাকে ঐ বিষয় গুলো খেয়াল করে তাপ কমিয়ে আনবেন অথবা আলাদা তাপ দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন ।

সতর্কতা:- বিদ্যুতের কাজ অবশ্যই পেশাদার লোক দিয়ে করাবেন বিদ্যুত এর তার বাল্ব বা অন্য কিছু যেন ছাগল, ভেড়া নাগাল না পায় পেলে বদ অভ্যাস অনুযায়ী চিবাতে থাকবে তাতে বিপদ ঘটতে পারে।

৬। পশু বাহিরে চরানো এবং সেড পরিস্কার :– যতক্ষন পর্যন্ত কুয়াশা না কমে ততক্ষন সেডের পর্দা তোলা যাবে না ঘর পরিস্কার করতে হবে প্রতিদিন । রৌদ্রে আলোতে কুয়াশা কমলে পশুগুলেকে ছাড়তে হবে এবং বিকালে রৌদ্রের আলো কমার সাথে সাথে সেডের ভিতরে আনতে হবে এরং পর্দা লাগিয়ে আলো আর হিটের ব্যবস্থা করতে হবে ।

কৃমি মুক্ত :- আমাদের মাধ্যে অনেকেরই মনে প্রশ্ন থাকতে পারে যে কৃমির কারনে ঠান্ডার কি সম্পর্ক…? প্রচন্ড শীতে গবাদী পশু বেশি ফুসফুস কৃমিতে আক্রান্ত হয়। ফুসফুসে এ্যাসকারিস কৃমির লার্ভা মাইগ্রেশনের কারনে কাশী, ঘন ঘন শ্বাস প্রশ্বাস নেয় এরং দেখা যায় নাক দিয়ে পাতলা এবং ঘন সর্দি লেগে থাকে যা কৃমির চিকিৎসা ছাড়া ভাল করা সম্ভব না। উপরে যে সরিষার খৈল বা দানাদার খাবারের কথা বলেছি যদি পেটে কৃমি থাকে তবে পাতলা পায়খানা হতে পারে তাই নিয়মিত কৃমি মুক্ত রাখবেন।
(-সম্পাদক।) লেখক :- গফ তধযরৎ ,মালিক :- ই.ইধৎরধ এড়ধঃং ঋধৎস

ফার্মসএন্ডফার্মার/১১অক্টোবর২০