হাইব্রিড মাগুর মাছ চাষে লাভবান হওয়ার সহজ পদ্ধতি

42

হাইব্রিড মাগুর মাছের চাষ আমাদের দেশে প্রায় সব অঞ্ছলেই হয়ে থাকে। হাইব্রিড মাগুর মাছ বৃহদাকারের হয়। এই মাছ মাংসাশী রাক্ষুসে। খুব দ্রুত এদের দেহের বৃদ্ধি হয়। মাগুর চাষের পুকুরে অন্য‌ মাছ রাখা বিপজ্জনক। আমাদের বাড়ির আশপাশের ছোট পুকুর কিংবা জলাশয়ে মাগুর মাছ চাষ করা যায়। আসুন জেনে নেই হাইব্রিড মাগুর মাছ চাষে আমাদের করণীয় সম্পর্কে-

পুকুর বা জলাশয়ের পাড়: এদের চাষের জন্য জলাশয়ের পাড় বেশ চওড়া করা দরকার। মাগুর মাছের বুকে হেঁটে বাইরে চলে যাওয়ার একটা প্রবণতা আছে। তাই পাড়টা একটু উঁচু করারও দরকার যাতে পানি থেকে অন্তত এক ফুট উঁচু থাকে অর্থাৎ ওই জলাশয়ে সর্বোচ্চ পানির তল যত হওয়ার সম্ভাবনা তার থেকে অন্তত একটু বেশি উচ্চতা থাকে। বর্ষাতে যদি বড় মাছ থাকে ওই জলাশয়ে, তবে জাল দিয়ে বা বাঁশের তৈরি চাটাইয়ের ব্যবস্থা রাখা দরকার যাতে মাছ অন্যত্র চলে যেতে না পারে। পুকুরের পাড় প্রায়শই ইঁদুর বা সাপের বসবাসের জন্য গর্ত থাকে। এগুলি থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পুকুরের পাড়ের ঢাল থাকা বাঞ্ছনীয়। এই ঢাল বাইরের দিকে ৩ : ১ এবং ভিতরের দিকে ৩ : ১ থেকে ৪ : ১ প্রয়োজন।

জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণ: পুকুরের সমস্ত আগাছা তুলে ফেলে উচিত বা মাগুর মাছের চাষ করার জন্য পুকুর আগাছাশূন্য হওয়া দরকার। বিশেষ করে পুরাতন জলাশয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগাছায় আক্রান্ত থাকে। মাগুর মাছ উদ্ভিদভোজী নয়। তাই ছোট বড় কোনও উদ্ভিদই এদের খাদ্য নয়। পরন্তু চলাফেরায় এরা ব্যাঘাত ঘটায়। এ ছাড়া এরা পানির নীচের দিকে থাকে। পানিতে অধিক আগাছা থাকলে পানির নীচের স্তরে আলো-বাতাস প্রবেশে বাধা দেয়।

অবাঞ্ছিত মাছের দমন: অবাঞ্ছিত মাছ বা অন্য জলজ পোকা পুকুরের পানিতে থাকলে মাছের বাড়বাড়ন্তে ব্যাঘাত ঘটায়। মাছের খাদ্য বা প্রাকৃতিক অনেক দান থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বার বার জাল টেনে এইগুলিকে নির্মূল করা উচিত। প্রয়োজনে পানি শুকিয়ে গেলে অথবা পানি কমে গেলে পুকুরে মহুয়া খোল প্রয়োগ করে এগুলিকে দমন করা যেতে পারে। মহুয়া খৈল প্রয়োগে সমস্ত ছোট প্রাণীর মৃত্যু ঘটে স্যাপোলিন নামক এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থের জন্য। এই রাসায়নিক ক্রিয়ার প্রভাব মহুয়া প্রয়োগের ১২ – ১৫ দিন পরে আর থাকে না। এই খৈলই পরে মাছের সোজাসুজি খাবার হিসাবে এবং মাছের প্রাকৃতিক খাবার উৎপাদনে সহায়ক হিসাবে কাজ করে।

মাছের চারা মজুত: মাগুর মাছের চারা সাধারণত প্রাকৃতিক নিয়মে পাড়া ডিম থেকে বাচ্চা হওয়ার পর সংগ্রহ করা হয়। বর্ষাকালে খাল, বিল, বাওড়, নালা প্রভৃতি জলাশয় থেকে পরিণত বয়সের প্রজননক্ষম-প্রজনেনচ্ছ মাছ সুযোগ পেলে বেরিয়ে এসে ধানক্ষেত বা আগাছাপূর্ণ অগভীর জলাশয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ডিম পাড়ে। সেই ডিম নিষিক্ত হয় এবং পরে তার থেকে বাচ্চা পরিস্ফুটিত হয়। এই রকম সম্ভাব্য জলাশয় থেকে সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে এই চারা সংগ্রহ করা হয়। এই সময় এদের ওজন প্রায় ৭ থেকে ১০ গ্রাম মতো হয়ে থাকে। এই পরিমাপের চারাই পালন ও মজুত পুকুরে চালান করে দেশি মাছের চাষ করা হয়।

প্রাকৃতিক নিয়মে মাগুর মাছের কোনও অভাব হওয়ার কারণ ছিল না। কিন্তু উপযুক্ত পরিণত প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা নানা কারণে পর্যাপ্ত না হওয়া, উপযুক্ত জলাশয়ের অভাব ও সর্বোপরি ধানক্ষেতে এবং কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক ব্যবহারের জন্য দেশি মাগুর মাছের চারা উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এর সমাধানসূত্র প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমেই খুঁজতে হবে।

চারা মজুত পদ্ধতি: উপযুক্ত জলাশয় নির্বাচন অথবা তৈরির পর দেখে নিতে হবে যেন পানিতে আগাছা, আমাছা, মাছ খেকো বড় মাছ না থাকে। পানির রঙ হালকা কালো। মহুয়া খোল প্রয়োগের ২০ / ২১ দিন পরে এবং অন্যান্য জৈবসার প্রয়োগের অন্তত ৭ দিন পর মাছের চারা ছাড়া উচিত। এই সময় চারা মাছের দৈর্ঘ্য ৭ – ১০ সেমি (৩ – ৪ ইঞ্চি) যার ওজন ৮ / ১০ গ্রাম হবে। মজুতকাল সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে।

মাছ চাষে পরিচর্যা: মাগুর মাছ জলজ উদ্ভিদকণায় (ফাইটো প্ল্যাঙ্কটন) খুব উৎসাহী নয়। তাই দেশি মাগুর চাষে রাসায়নিক সার প্রয়োগের তেমন প্রয়োজন নেই। তবে সাধারণ কার্প জাতীয় মাছের মিশ্রণ থাকলে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়, অন্যথায় নয়।

মাগুর মাছ চাষে প্রতি মাসে বিঘা প্রতি ১০০ – ১২৫ কেজি (৭৫০ – ৮৫০ কেজি হেক্টর প্রতি) কাঁচা গোবর প্রয়োগ করতে হয়। এই গোবর মাগুর মাছ সোজাসুজি খাবার হিসাবে নেয়। এ ছাড়া পানিতে সূক্ষ্ম প্রাণীকণার জন্ম হয়, যেগুলি মাগুর মাছের প্রিয় খাদ্য। তাই নিয়ম করে মাগুর মাছ চাষে কাঁচা গোবর প্রয়োগ প্রয়োজন। গোবর প্রয়োগের ফলে এবং নানাবিধ কারণে পানি দূষণের প্রবণতা থাকে। এ ছাড়া চুন মাছের খাদ্য হিসাবে প্রয়োজন। তাই কাঁচা গোবর প্রয়োগের অন্তত ৭ – ১০ দিন বাদে বিঘা প্রতি ৮ – ১০ কেজি কলি চুন (৬০ – ৭৫০ কেজি হেক্টরে) প্রয়োগ ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রতি মাসে অন্তত এক বার টানা জাল টেনে অথবা খ্যাপলা জালের সাহায্যে মাছ ধরে তাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা, তাদের বৃদ্ধির গতি ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হবে, যাতে মাছ সম্পর্কে আমাদের সম্যক জ্ঞান থাকে — প্রয়োজনমতো ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে পুকুরে জাল টানলে মাছের ব্যায়াম হবে যা তাদের বৃদ্ধিতে সহায়ক।

গ্রীষ্মের সময়, বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিল মাসে জলাশয়ের পানি একেবারে কমে যায়। তখন পানিতে শ্যাওলার আধিক্য ঘটে যা মাগুর মাছ চাষে বিঘ্ন ঘটায়। এই শ্যাওলা নির্মূল করার ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ লাগিয়ে এগুলি নানা উপায়ে তুলে ফেলতে হবে। তুঁতে প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া এই সময় পানির উত্তাপ ভীষণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে মাছ অস্বস্তিতে থাকতে পারে। অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে পারে। মানুষ (চোর) বা অন্য মৎস্যভূক প্রাণীর পেটে যেতে পারে। তাই

মাঝেমাঝে পানির মধ্যে ইতস্তত গর্ত (এক বর্গমিটার বা ততোধিক মাপের এবং যথাসম্ভব গভীর) তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে মাছগুলি প্রয়োজনে অস্থায়ী ভাবে আশ্রয় নিতে পারে।
মাঝেমাঝে তালপাতা পুঁতে রাখলে এবং পানিতে ফেলে রাখলে ওই স্থান অপেক্ষাকৃত কম উত্তপ্ত হবে, যেখানে মাছের অস্থায়ী আশ্রয় হতে পারে। মাছের অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখলে প্রয়োজনমতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

মাছের খাদ্য:মাগুর মাছের জন্য পরিপূরক খাদ্যের উপাদানগুলি হল —উদ্ভিদ উপাদান, প্রাণীজ উপাদান, অন্যান্য উপাদান। খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, ওষুধ ইত্যাদি।

১) উদ্ভিদ উপাদান : চালের গুঁড়ো (খুদ), চালের কুঁড়ো, ডালের গুঁড়ো, সয়াবিন, বাদাম গুঁড়ো বা খোল, সরষের খৈল ইত্যাদি। তণ্ডুল জাতীয় খাবার শর্করা ও তৈলবীজ বা খৈল প্রোটিন ও তৈল জাতীয় খাদ্যোপাদান সমৃদ্ধ। এ ছাড়াও ভিটামিন ও অন্যান্য খাদ্যোপাদান এতে কমবেশি বর্তমান থাকে।

২ ) প্রাণীজ উপাদান : রেশমকীটের মুককীট, কেঁচো, শুটকি মাছের গুঁড়ো, শুকনো চিংড়ির গুঁড়ো, মাংসের কুচি, গেঁড়ি, গুগলি শামুকের মাংসল অংশ, কাঁচা গোবর, গোবর গ্যাস প্ল্য‌ান্টের পরিত্যক্ত দ্রব্য ইত্যাদি। এগুলি অধিকাংশ প্রোটিন, ভিটামিন, তৈল ও খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ।
৩ ) অন্যান্য উপাদন : যেমন বাড়ির খাবারের যে কোনও পরিত্যক্ত মাছমাংসের অংশ, মাছ, মুরগি, ছাগল ইত্যাদির জীবিত বা মৃত অবস্থার পরিত্যক্ত অংশ যেমন মল, রক্ত, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি ইত্যাদি। এ সবই মাগুর মাছের ভীষণ প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান।

আহরণ বা মাছ ধরা: এই মাছ ধরার জন্য ছাঁকনি জাল অথবা খ্যাপলা জাল ব্যবহার করা হয়। খ্যাপলা জাল ইতস্তত ফেলে মাছ ধরা হয়। স্বল্প পরিমাণ মাছের প্রয়োজনে খ্যাপলা জাল দিয় ধরা হয়ে থাকে। যখন পরিমাণে বেশি মাছ ধরার পরিকল্পনা থাকে বা প্রয়োজন হয় তখন ছাঁকনি জালের ব্যবহার করা হয়। এই জাল জলাশয়ের পাড়ের দুই প্রান্ত দিয়ে মানুষ টেনে নিয়ে যায়। যে হেতু মাগুর মাছ পানির নিম্ন স্তরে বসবাসকারী এবং নীচের পাঁকের মধ্যে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে তাই জালে সব মাছ ধরা যায় না।
মাগুর মাছ ধরার উৎকৃষ্ট সময় হল যখন জলাশয়ের পানি কমে আসে।
খুব অল্প পরিমাণে বা চাষির নিজের খাবার জন্য অনেক সময় কলসি বা ঝুড়িতে গোবর / খৈল / চালের কুড়ো বা সিদ্ধ খুদ দিয়ে ফেলে রাখলে মাগুর মাছ ওর ভিতর ঢুকে থাকে এবং ধরা পড়ে।