হাওরে প্রায় বিলুপ্ত দেশি ধান

124

‘আগের দিনের দেশি ধানের কথা মনে অইলে অহনও গেরান (ঘ্রাণ) নাহে (নাকে) লাগে। ভাতের মজা জিবরায় (জিহ্বায়) লাইগ্যা থাহতো (থাকত)। যেকুনু ছালুন (তরকারি) দিয়া খাওনের রুচি অইত। হুদা ভাতও পেড ভইরা খাওন যায়, দেশি চাউলের ভাত অইলে।’ কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার কৃষক আব্দুল হাই। তিনি আরও বলেন, ‘হাওরের হারিয়ে যাওয়া গভীর পানির ধান বইয়াখাউরি। এ ধান রোইয়া (রোপণ) কৃষক আর ক্ষেতে গিয়ে উহি (উঁকি) দিত না। বাড়িতে নিশ্চিন্ত মনে বইয়া-খাইয়া দিন কাটাইতো। আর ধান পাকলে কাইট্টা বাড়িত আনত। এর লাইগ্যা (এজন্য) এই ধানের নাম বইয়াখাউরি।’

স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বকারী এসব ধান কালের পরিক্রমায় উচ্চ ফলনশীল ধানের আধিপত্যে হারিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলেন, উফশী ও হাইব্রিড জাতের ধান ভালো ফলন দিলেও এর বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। এবার উফশী জাতের ব্রি ২৮, ব্রি ২৯, ব্রি ৮৯ ধানে ব্লাস্টের সংক্রমণ এর উদাহরণ। এ পরিস্থিতিতে দেশের কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাওরের গভীর পানির ধানের জাতগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে অধিক ফলনশীল করার জন্য উদ্যোগ নেয়ার দাবি করেন তারা।

জানা যায়, হাওরাঞ্চলে একসময় প্রায় ২২৮ প্রজাতির বোরো ধান চাষ হতো। এসব প্রজাতির মধ্যে ছিল টেপি, বোরো, রাতা, শাইল, লাখাইয়া, মুরালি, চেংড়ি, কালিজিরা, সমুদ্রফেনা, হাসিকলমি, কাশিয়াবিন্নি, দুধবাকি, দুধসাগর, লাটলী, মারতি, তুলশীমালা, আখনিশাইল, গাছমালা, খৈয়াবোরো, দেউড়ি, কন্যাশাইল, বিচিবোরো, লোলাটেপী, পশুশাইল, হাসেরডিম, গুয়ারশাইল, বেতি, ময়নাশাইল, গদালাকি, বিরইন, খিলই, ছিরমইন, আগুনি, গুলটিহি, ল্যাটা, জগলীবোরোর প্রভৃতি।

বানের পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা দেশি ধান ছিল হাওরের কৃষকের ভরসা ও শক্তির প্রতীক। বেশি ফলনের কথা বলে সরকারি-বেসরকারিভাবে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান চাষ করা হচ্ছে। তবে ফলন বেশি হলেও দেশি ধানের তুলনায় উফশী ধান পাকে দেরিতে। ফলে আগাম বন্যায় প্রতিবছর এই ধানের ক্ষতি হয়। সে তুলনায় এখন অল্প জমিতে কৃষকরা দেশি ধান রোপণ করে লাভবান হচ্ছে। খরচ ছাড়াই চাষকৃত দেশি ধান পানি আসার আগেই কেটে ফেলা যায়। হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু কৃষক এখনও দেশি ধান চাষ করছে। চলতি মৌসুমে এসব ধান এরই মধ্যে কেটে গোলায় তুলেছে কৃষক। ফলনও হয়েছে ভালো। একরপ্রতি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান। দেশি ধানের চাষ এখন সচ্ছল কৃষকের শৌখিনতায় রূপ নিয়েছে। আর সাধারণ কৃষকেরা হাওরের একবারে তলায় কিছু চাষাবাদ করে।

ধর্মপাশা উপজেলার সুখাড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাই জানান, দেশি ধান অবহেলায় জমিতে বেড়ে ওঠে, পাকে আগে। চাষ করতে কোনো বাড়তি খরচই নেই। সার-কীটনাশক কিছুই লাগে না। এবার তিনি এক বিঘা জমিতে দেশি লাখাইয়া বোরো জাতের ধান চাষ করেছেন। ভালো ফলন হয়েছে।

মধ্যনগর উপজেলার বংশিকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম জানান, তিনি টাঙ্গুয়ার হাওরে ২৫ বিঘা জমিতে দেশি জাতের ধান শাইল বোরো চাষ করেছিলেন। বীজ ছিল নিজের ঘরের। সর্বসাকুল্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ক্ষেতে চারা রোপণের পর কোনো সার বা কীটনাশক দেননি। আগাছা দমন করতে হয়নি, দিতে হয়নি পানি সেচ। ফলনও হয়েছে ভালো। মৌসুমে সবার শেষে রোপণ করেও সবার আগে সোনা রঙের ঝকমকে ধান গোলায় তুলেছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আর ধান উৎপাদন হয়েছে বিঘাপ্রতি ১০ মণ হারে প্রায় ২৫০ মণ, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, দেশীয় গভীর পানির ধানের জাতকে উচ্চ ফলনশীল করতে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কাজ করে যাচ্ছে। সর্বশেষ আবিষ্কৃত ধানের জাতগুলোর মধ্যে দেশীয় জাতের কম্বিনেশন রয়েছে। তিনি বলেন, চলতি বছর ধর্মপাশা ও মধ্যনগরের হাওরে ৩১ হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো আবাদ করা হয়েছে। এবারের ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২০০ মেট্রিক টনের মধ্যে। ব্রি-২৮ ধানের চাষ হয়েছে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে। আর দেশীয় ধানের চাষ হয়েছে মাত্র ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ হেক্টর জমিতে।