ধান শুকানো যন্ত্রের ব্যবহারে কমবে খরচ, শ্রম ও সময়

167

চলছে বোরো ধানের মৌসুম। বোরো ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলার কৃষকরা। বাংলা বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল, মে ও জুন) পুরোটা সময় চলবে এই ধান কাটা। বর্তমানে রিপার ও কম্বাইন্ড হারভেস্টার থাকায় খুব সহজেই ধান কেটে ঘরে তুলছেন হাওরসহ অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকরা। কিন্তু ধান কাটার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ ধান শুকিয়ে তা সংরক্ষণ করা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কৃষকদের। অনেক সময় ধান শুকানোর পর্যাপ্ত জায়গা পায় না তারা ছোট হয়ে আসছে উঠান। আবার এদিকে গ্রীষ্মের শুরু থেকেই চলছে তাপদহ। প্রচণ্ড রোদ আর গরমে মাঠে ধান শুকানোও অসম্ভব হয়ে উঠছে। তীব্র রোদে বারবার ধান উল্টেপাল্টে দিয়ে শুকানোও কষ্টসাধ্য। কড়া রোদে ছাতা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। পাশাপাশি হুট করে চলে আসা বৃষ্টি ভিজিয়ে দিতে পারে অপ্রস্তুত কৃষকের মাঠভরা ধান। ভালোভাবে শুকানোর অভাবে ধান সংরক্ষণ করতে পারে না কৃষকরা। ফাঙ্গাস ও পোকার আক্রমণেও নষ্ট হয় ধান। ফসল কাটা থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত অপচয় হয় প্রায় ১৫ ভাগ। যা রোধ করা গেলে বৃদ্ধি পাবে খাদ্য নিরাপত্তা। এজন্যে প্রয়োজন হবে আধুনিক কৃষি যন্ত্রের।

এ সমস্যার সমাধানে ধান শুকানো ও সংরক্ষণ পদ্ধতিকে যান্ত্রিকীকরণের আওতায় নেয়ার জন্য কাজ করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোস্ট হারভেস্ট লস রিডাকশন ইনোভেশন ল্যাবের (পিএইচএলআইএল) একদল গবেষক। উদ্ভাবন করেছে বিএইউএসটিআর ড্রায়ার এবং কোকুন সমৃদ্ধ পাঁচ স্তরবিশিষ্ট হারমেটিক ব্যাগ। ড্রায়ারের মাধ্যমে রোদ বা বৃষ্টি যেকোনো সময়েই এবং যেকোনো জায়গায় এমনকি ঘরের বারান্দাতেও ধান শুকানো যায় খুব সহজেই। বায়ুরোধী কোকুন সমৃদ্ধ হারমেটিক ব্যাগে অক্সিজেন প্রবেশ করতে পারে না। ফলে অভ্যন্তরীণ পোকামাকড় মারা যায়। সনাতন পদ্ধতিতে সংরক্ষণে অপচয় হয় শতকরা প্রায় ৬ ভাগ। আবার ড্রায়ার ব্যবহারে অপচয় কমে ২-৩ ভাগ। সেক্ষেত্রে ড্রায়ার ও হারমেটিক ব্যাগের ব্যবহারে অপচয় কমাবে শতকরা প্রায় ৬ ভাগ।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, গত ২০১৯-২০ সালে ধানের মোট উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৩শ ৩০ টন। এক্ষেত্রে শুকানো এবং সংরক্ষণে যন্ত্রের ব্যবহারে ধানের অপচয় প্রায় ২১ লাখ ২১ হাজার ৭শ ১৯ টন রোধ করা সম্ভব হতো।

পিএইচএলআইএলের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম বলেন, বাংলাদেশের কৃষি এখন আধুনিক, যান্ত্রিক এবং বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। নিজ উৎপাদনশীলতা এবং বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। ধান লাগ লাগানো, কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই এসব কাজে যন্ত্রের ব্যবহার কায়িক শ্রম ও সময় বাঁচায় প্রায় শতকরা ২০ ভাগ। বীজ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ কমায় শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ।

রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা ড্রায়ারের বিষয়ে বলেন, আমাদের দেশে বিশেষ করে বোরো মৌসুমে হঠাৎ বৃষ্টি, ঝড় এবং অতিবৃষ্টির কারণে ধান শুকানোতে বেগ পেতে হয় কৃষকদের। আবার শুকাতে না পারলে নষ্ট হয়ে যায় ধান। কৃষকের এই দুর্ভোগ কমাতেই কম সময়, কম খরচ ও কম কায়িক শ্রমে ধান শুকানোর জন্য আমরা এ ড্রায়ারের উদ্ভাবন করেছি। পাশাপাশি ড্রায়ারে শুকালে সনাতন পদ্ধতির তুলনায় অপচয় বাঁচে প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ। এলপিজি গ্যাসচালিত আমাদের ড্রায়ারে ধানের মধ্যে বাষ্প প্রবাহিত করা হয় এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেন্সর ব্যবহার করা হয়। বীজ ধানের জন্য এই তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি এবং খাবার ধানের জন্য ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা হয়। এছাড়া ফল ও সবজির ক্ষেত্রে কর্তন-পরবর্তী অপচয় হয় প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ। এই অপচয় কমাতেও আমরা হাইব্রিড ড্রায়ার নিয়ে কাজ করছি। ড্রায়ারের ব্যবহারে কৃষক মৌসুমি ফসলগুলো শুকিয়ে পরে সরবরাহ করতে পারবে। যার ফলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন। পাশাপাশি পুষ্টি সরবরাহও বজায় থাকবে সারা বছর।